২০২৫ সালের উপদেষ্টা সরকার: দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন


দৈনিক আলোড়ন
২০২৫ সালের উপদেষ্টা সরকার: দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ২০২৫ সালে যে উপদেষ্টা-নির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠে, তা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা ছিল অত্যন্ত বেশি। অনেকেই ভেবেছিলেন—এই ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতি কমবে, প্রশাসনে স্বচ্ছতা আসবে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন ঘটনা ও অভিযোগ সেই আশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

প্রথমত, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ নিয়ে শত শত অভিযোগ জমা পড়েছে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে নাগরিকদের কাছ থেকে ৯০০-এর বেশি অভিযোগ জমা পড়ে, যেখানে ঘুষ, প্রশাসনিক অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠে। 

দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কিত একটি অধ্যাদেশে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব বাদ দেওয়া হয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)। সংস্থাটি জানায়, এই ধরনের পদক্ষেপ দুর্নীতি দমনের কাঠামোকে দুর্বল করতে পারে এবং এটি সংস্কারের বিপরীত একটি দৃষ্টান্ত। 

তৃতীয়ত, বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়নি। সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়, কিছু উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু হলেও পরে তা দীর্ঘ সময় অগ্রসর হয়নি, যা প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করে। 

চতুর্থত, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। উদাহরণস্বরূপ, বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা হলেও সংশ্লিষ্টদের অনেক ক্ষেত্রে আইনের আওতায় আনা হয়নি—যা প্রশাসনিক সংস্কারের ব্যর্থতার দিকটি স্পষ্ট করে। 

এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার ও বড় দুর্নীতির তদন্তে বিদেশি সংস্থাগুলোর সহযোগিতা নেওয়ার আলোচনা হয়েছে, যা দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির ব্যাপকতার ইঙ্গিত দেয়। 

সব মিলিয়ে ২০২৫ সালের উপদেষ্টা ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং দুর্নীতি দমন। কিন্তু বাস্তবতার অনেক দিক দেখিয়েছে যে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আরও দৃশ্যমান হয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—জনগণের আস্থা ধরে রাখা। যদি সেই আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে কোনো প্রশাসনিক কাঠামোই দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে না। তাই ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সত্যিকারের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।