
অপূর্ব আহমেদ জুয়েল:- একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি—রুমিন ফারহানা—হেনস্তার শিকার হন, তাঁর পুষ্পস্তবক ছিঁড়ে ফেলা হয়, তাহলে সেটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার সুযোগ থাকে না। এটা স্পষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হলো, যে দল নিজেদের গণতন্ত্রের ধারক বলে পরিচয় দেয়, তাদের কর্মীরা যদি ভাষা শহীদদের স্মরণের দিনেও সহনশীলতা না দেখায়, তাহলে তারা আসলে কীসের রাজনীতি করছে?
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত অবস্থানে দাঁড়িয়ে। উপরে নীতিকথা, ভদ্র ভাষণ, সংস্কারের প্রতিশ্রুতি—আর নিচে মাঠপর্যায়ে উগ্রতা, বিশৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রণহীন বক্তব্য। শীর্ষ নেতৃত্ব কি সত্যিই এসব জানে না, নাকি জানে কিন্তু চুপ থাকে? যদি ক্যামেরার সামনে এমন আচরণ সম্ভব হয়, তাহলে ক্যামেরার বাইরে কী ঘটে—সেটা কল্পনা করাই কঠিন।
দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায়ই নীতির কথা বলেন, নতুন রাজনীতির কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—কথা আর কাজের ব্যবধানই এখন সবচেয়ে বড় সংকট। নীতির ভাষণ দিয়ে মাঠের বিশৃঙ্খলা ঢেকে রাখা যায় না। শৃঙ্খলা যদি দলীয় সংস্কৃতির অংশ না হয়, তাহলে সেটা কেবল মঞ্চসজ্জা।
আরও উদ্বেগজনক হচ্ছে চাঁদাবাজি নিয়ে ভাষার কারসাজি। যখন একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে বলেন, সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা তোলা চাঁদাবাজি নয়—তখন বোঝা যায় সমস্যা কেবল অপরাধে নয়, সমস্যা চিন্তায়। আইন যেখানে স্পষ্ট, সেখানে শব্দ বদলে অর্থ বদলানোর চেষ্টা আসলে অপরাধকে স্বাভাবিক করার কৌশল। আজ “সমঝোতা”, কাল “সহযোগিতা ফি”—এভাবে কি অবৈধ আদায়কে বৈধতার মোড়ক দেওয়া হবে? প্রশ্ন জাগে, দল কি সত্যিই চাঁদাবাজির নতুন অভিধান লিখতে বসেছে?
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও আত্মপরিচয়ের সংকট স্পষ্ট। ভারতীয় শিল্পীদের আদর্শ মানা দোষের নয়, কিন্তু নিজের দেশের কিংবদন্তিদের উপেক্ষা করে যদি অন্যদের তালিকায় রাখা হয়, তাহলে সেটা মানসিক নির্ভরতার পরিচয়। নিজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবমূল্যায়ন করে কোনো জাতি শক্তিশালী হয় না। রাজনীতির মতো সংস্কৃতিতেও যদি আত্মবিশ্বাস না থাকে, তাহলে সেটি নেতৃত্বের দুর্বলতার ইঙ্গিত।
সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায় পররাষ্ট্রনীতিতে। একসময় যাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযোগ তোলা হয়েছিল, আজ তাঁদেরই দায়িত্বের আসনে বসানো হচ্ছে। তাহলে তখনকার অভিযোগগুলো কি কেবল রাজনৈতিক অস্ত্র ছিল? যদি মিথ্যা হয়, তাহলে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। আর যদি সত্যি হয়, তাহলে আজ সেই নীতির অবস্থান কোথায়? রাজনীতিতে স্মৃতিভ্রংশ বড় সুবিধাজনক—কিন্তু জনগণের স্মৃতি এত সহজে মুছে যায় না।
সব মিলিয়ে বিষয়টা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটা ধারাবাহিকতা—ভাষা দিবসে অসহিষ্ণুতা, অর্থনীতিতে শব্দের কারসাজি, সংস্কৃতিতে আত্মবিস্মৃতি, পররাষ্ট্রনীতিতে অবস্থান বদল। প্রশ্ন একটাই: এই রাজনীতি কি আদর্শনির্ভর, নাকি সুবিধানির্ভর? যদি আদর্শই ভিত্তি হয়, তাহলে তার প্রতিফলন আচরণে থাকতে হবে। আর যদি প্রতিদিন সুবিধা অনুযায়ী ভাষা বদলায়, তাহলে সেটি আর নীতি নয়—সেটি কৌশল মাত্র।
গণতন্ত্র কেবল স্লোগানে টিকে থাকে না। তা টিকে থাকে আচরণে, আত্মসমালোচনায়, এবং ভুল স্বীকার করার সাহসে। সেই সাহস কি সত্যিই আছে? নাকি নতুন বাংলাদেশের নামে পুরোনো রাজনীতিই নতুন ভাষায় ফিরে আসছে?