২২ দিনে ৫ জন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকিতে?


দৈনিক আলোড়ন
২২ দিনে ৫ জন—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকিতে?

অপূর্ব আহমেদ জুয়েল:- সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী মত প্রকাশের অভিযোগে ২২ দিনে অন্তত ৫ জনের গ্রেফতার—সংখ্যার দিক থেকে এটি বড় ঘটনা না মনে হলেও, রাজনৈতিকভাবে এর তাৎপর্য গভীর। কারণ, এই ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তিগত অপরাধের প্রশ্ন নয়; বরং রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিক স্বাধীনতার সম্পর্ককে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

বিএনপি সরকারের অধীনে এই ধরনের গ্রেফতার একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে:

রাষ্ট্র কি সমালোচনাকে সহ্য করতে পারছে, নাকি সেটিকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতার বৈধতা আসে জনগণের কাছ থেকে, আর সেই বৈধতাকে টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জবাবদিহিতা। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যমই হলো সমালোচনা—বিশেষ করে রাজনৈতিক সমালোচনা। কিন্তু যখন সেই সমালোচনাকেই “অপরাধ” হিসেবে দেখা হয়, তখন গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোতেই ফাটল ধরতে শুরু করে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আইনের প্রয়োগ। সরকার বলছে, সবকিছু আইনের মধ্যে থেকেই করা হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটা অন্য জায়গায়—

আইন কি নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হচ্ছে, নাকি এটি ক্ষমতা রক্ষার একটি উপকরণ হয়ে উঠছে?

যদি আইন এমনভাবে প্রয়োগ হয় যেখানে সমালোচকরা টার্গেট হয়, আর সমর্থকরা একই ধরনের বক্তব্য দিয়েও অক্ষত থাকে, তাহলে সেটি আইনের শাসনের ধারণাকে দুর্বল করে। এতে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়, এবং আইন নিজেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে পড়ে।

এই প্রক্রিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভয়ের সংস্কৃতি।

গ্রেফতারের সংখ্যা যতই কম হোক, এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে অনেক দূর পর্যন্ত। মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে—কোনো কিছু লেখার আগে ভাবতে থাকে, “এটা কি আমার জন্য বিপদ ডেকে আনবে?” এই আত্মনিয়ন্ত্রণ বা self-censorship গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর, কারণ এতে নাগরিক অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে কমে যায়।

রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি নতুন কিছু নয়। ইতিহাস বলে, যখনই কোনো সরকার সমালোচনাকে সহ্য করতে ব্যর্থ হয়, তখনই সে আইন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যবহার করে মতপ্রকাশ সীমিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রায় সবসময়ই নেতিবাচক—এতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ে, সামাজিক বিভাজন গভীর হয় এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—

গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকের কণ্ঠস্বর, ভিন্নমত এবং সমালোচনা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

যদি সেই কণ্ঠস্বর ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যায়, তাহলে বাহ্যিকভাবে গণতন্ত্রের কাঠামো থাকলেও, ভেতরে ভেতরে সেটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

🔚 উপসংহার

২২ দিনে ৫ জন গ্রেফতার—এটি হয়তো একটি পরিসংখ্যান।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিতে এটি একটি সতর্ক সংকেত।